অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাল বাংলাদেশ। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে সফরকারীরা। ম্যাচজুড়ে ব্যাটিং, পেস ও স্পিন—তিন বিভাগেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। আর এই সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে পাঁচ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মিরাজ। তার নিয়ন্ত্রিত অফস্পিনের সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
এর আগে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের ব্যাটিং ধসের মূল কারণ ছিলেন পেসার হাসান মাহমুদ। তিনি একাই তুলে নেন ছয় উইকেট। তার আক্রমণাত্মক ও কার্যকর পেস বোলিং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে শুরু থেকেই চাপে রাখে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাট হাতে দারুণ দৃঢ়তা দেখায়। সফরকারীদের ইনিংস থামে ৪২৬ রানে। এতে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রান, যা ম্যাচের গতিপথ অনেকটাই বদলে দেয়।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন তানজিদ হাসান। তিনি করেন ১০১ রানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হিসেবে ইনিংসটি বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। তার সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রান বাংলাদেশের বড় সংগ্রহ গড়ার ভিত শক্ত করে। মুমিনুল হকের ৪৯ রানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসটি দলের লিড আরও বাড়াতে সহায়তা করে।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া অবশ্য সহজে হাল ছাড়েনি। ক্যামেরন গ্রিন শতরানের ইনিংস খেলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তার ১০৪ রান স্বাগতিক দলকে বড় বিপর্যয় থেকে সাময়িকভাবে সামলে ওঠার সুযোগ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা চাপ কমতে দেননি। হাসান মাহমুদের পেসের পর মিরাজের স্পিন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানেই গুটিয়ে যায় স্বাগতিকদের ইনিংস।
মিরাজের পাঁচ উইকেট নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। এমন ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সফরকারীরা মাত্র এক উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করে। শেষ মুহূর্তে কোনো নাটকীয়তা দেখা যায়নি; বরং ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণই ছিল জয়টির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
এই জয়ের আরেক বড় নায়ক হাসান মাহমুদ। ম্যাচে মোট নয় উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচসেরার পুরস্কারও পান। প্রথম ইনিংসে তার ছয় উইকেট অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে আটকে দেয়। পরে মিরাজের স্পিন আক্রমণ স্বাগতিকদের দ্বিতীয় ইনিংস দ্রুত শেষ করে দেয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে পেস ও স্পিনের সমন্বয় অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে এবারের সাফল্য আলাদা গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এবারই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব মাটিতে স্বাগতিকদের টেস্টে হারানোর কৃতিত্ব অর্জন করল বাংলাদেশ।
মিরাজের পাঁচ উইকেটের কীর্তিও আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া সফরকারী স্পিনারদের বিরল তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এর আগে ২০১৯ সালে সিডনি টেস্টে ভারতের কুলদীপ যাদব অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন। ২০১২ সালে হোবার্টে শ্রীলঙ্কার রঙ্গনা হেরাথ অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে ৫/৯৫ বোলিং বিশ্লেষণ করেছিলেন।
ডারউইনের এই জয় তাই শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের ফল নয়। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নিজেদের সামর্থ্য নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রশ্নের একটি শক্তিশালী উত্তরও দিয়েছে এই পারফরম্যান্স। তানজিদের সেঞ্চুরি, শান্তর দৃঢ় ব্যাটিং, হাসান মাহমুদের নয় উইকেট এবং মিরাজের ব্যাট-বল দুই বিভাগে কার্যকর অবদান—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের একটি পরিপূর্ণ দলীয় জয়।
বিশেষ করে মিরাজের পারফরম্যান্স ম্যাচটির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। প্রথম ইনিংসে ৬৫ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট—একই ম্যাচে ব্যাট ও বল হাতে এমন কার্যকর অবদান বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের ভিত আরও শক্ত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় তাই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল, আর সেই অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র হয়ে উঠলেন মেহেদী হাসান মিরাজ।