সেপ্টেম্বরের ভারত সিরিজ ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বহুল প্রতীক্ষিত সাদা বলের সিরিজ নিয়ে আবারও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। আগামী সেপ্টেম্বরের এই সফর ঘিরে দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তুঙ্গে থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা সিরিজটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকেও এখন আর আগের মতো দৃঢ় নিশ্চয়তার কথা শোনা যাচ্ছে না।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ভারতীয় দলের ২৮ আগস্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা। এরপর ১, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর তিনটি একদিনের আন্তর্জাতিক এবং ৯, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর তিনটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ সফরে মোট ছয়টি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা রয়েছে দুই দলের। সূচি অনুযায়ী সিরিজ শুরুর সময়ও খুব বেশি দূরে নয়।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সফরটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ক্রমেই বাড়ছে। ৭ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক কর্মকর্তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে সফরটির সম্ভাবনা অনিশ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক আরেকটি প্রতিবেদনে পরিস্থিতিকে ‘৫০-৫০’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত সফর নিয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

এই অনিশ্চয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতি। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে। ক্রিকেটও তার বাইরে নয়।

এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে হওয়ার কথা থাকা ভারত-বাংলাদেশের ছয় ম্যাচের সিরিজ শেষ পর্যন্ত আয়োজন করা হয়নি। পরে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সম্মতিতে সেটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই পুনর্নির্ধারিত সিরিজই এখন আবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

তবে সিরিজটি আয়োজনের প্রস্তুতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আগে থেকেই নিয়ে আসছিল। চলতি বছরের শুরুতে ঘোষিত আন্তর্জাতিক সূচিতে ভারত সফরকে বাংলাদেশের ঘরের মাঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে রাখা হয়েছিল। সিরিজের সম্প্রচার ও ডিজিটাল স্বত্ব নিয়েও প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এসব পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যায়, ভারতীয় দলকে আতিথ্য দেওয়ার ব্যাপারে বিসিবির পরিকল্পনা ছিল সুস্পষ্ট।

এই সিরিজের গুরুত্ব শুধু মাঠের ছয়টি ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় দল বাংলাদেশ সফরে এলে সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, পৃষ্ঠপোষকতা, টিকিট বিক্রি এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক কার্যক্রম তৈরি হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক সচল রাখার ক্ষেত্রেও দ্বিপক্ষীয় সিরিজটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের যোগাযোগ ও প্রস্তুতিতে কিছুটা ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ প্রকাশ্যেই সিরিজ আয়োজনের ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় সেই আশাবাদ এখন অনেকটাই সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে।

সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সূচি অনুযায়ী ২৮ আগস্ট ভারতীয় দলের বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা। ফলে সফর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর হাতে সময় দ্রুত কমে আসছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজ আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু দুই দলের সম্মতিই যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা, ভ্রমণ, আবাসন, অনুশীলন, ভেন্যু ব্যবস্থাপনা, সম্প্রচার এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির মতো অনেক বিষয় একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।

বিসিবিও তাই আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজ বাতিল বা স্থগিতের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আয়োজনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সে বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে ক্রিকেটাঙ্গন।

ভারত সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সূচিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের আয়ারল্যান্ড সফর স্থগিত করা হয়েছে, কারণ ভারতকে ঘরের মাঠে আতিথ্য দেওয়ার পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সিরিজ অনুষ্ঠিত না হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের এই সিরিজ এখন কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট আয়োজন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের বর্তমান সম্পর্ক, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ক্রিকেট প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক স্বার্থ। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৮ আগস্ট ভারতীয় দলের বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও সফরটি শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়াবে কি না, তা নিশ্চিত করতে এখন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষাই করতে হচ্ছে।

মন্তব্য করুন