অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখেছেন পেসার হাসান মাহমুদ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৫৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ের পাশাপাশি গড়েছেন বিরল এক কীর্তি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো পেসারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকারের রেকর্ড এখন তার দখলে।
হাসানের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিন সংস্করণ মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এক ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার ঘটনাও এবারই প্রথম। এর আগে টেস্টে মাশরাফি বিন মুর্তজা তিন উইকেট, ওয়ানডেতে রুবেল হোসেন চার উইকেট এবং টি-টোয়েন্টিতে তাসকিন আহমেদ চার উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ সাফল্যের নজির গড়েছিলেন। হাসান সেই সীমা পেরিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছেন।
সফরে যাওয়ার আগে নিজের লক্ষ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার সফরে অন্তত দুবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এমনকি একা থাকলেও সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের কল্পনা করতেন এই ডানহাতি পেসার। ডারউইনের মাঠে প্রথম ইনিংসেই সেই স্বপ্নের একটি বড় অংশ বাস্তবে রূপ নিল। পাঁচে থামেননি; ছয় উইকেট নিয়ে ফিরেছেন তিনি।
শুরু থেকেই হাসানের বোলিংয়ে ছিল নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন। প্রথম ঘণ্টায় কোনো উইকেট না পেলেও অফ স্টাম্পের বাইরে ধারাবাহিকভাবে বল করে জেক ওয়েদারাল্ডকে চাপে রাখেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই চাপই কাজে দেয়। প্রলুব্ধ হয়ে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন ওয়েদারাল্ড। এরপর অতিরিক্ত বাউন্স ও মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে ট্রাভিস হেডকেও ফিরিয়ে দেন হাসান। নিজের প্রথম স্পেলেই দুই উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে বড় ধাক্কা দেন তিনি।
বাংলাদেশের অন্য বোলাররাও তখন একপ্রান্ত থেকে চাপ ধরে রাখছিলেন। তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ দেননি। ফলে হাসানের তৈরি চাপ আরও কার্যকর হয়ে ওঠে।
মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর আবার আক্রমণে ফেরেন হাসান। এবার তার শিকার অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। পরের ওভারেই মিচেল স্টার্ককে একইভাবে ক্যাচ বানিয়ে ইনিংসে নিজের চতুর্থ উইকেট পূর্ণ করেন হাসান।
তবে তার সেরা মুহূর্ত তখনও বাকি ছিল। চা-বিরতির পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দ্রুতই হাসানকে আক্রমণে ফিরিয়ে আনেন। দায়িত্ব পেয়েই সাফল্য এনে দেন এই পেসার। বাউন্সার পুল করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন স্টিভ স্মিথ। সেই উইকেটের সঙ্গে পাঁচ উইকেট পূর্ণ হয় হাসানের। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শেষদিকে ন্যাথান লায়নকে নিজের বলে ক্যাচ বানিয়ে ছয় উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করেন তিনি।
হাসানের বোলিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নিয়ন্ত্রণ। ডারউইনের পিচে বাউন্স ও মুভমেন্টকে কাজে লাগালেও তিনি অযথা আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করেননি। লাইন ও লেংথ ঠিক রেখে ব্যাটারদের ভুল করার জন্য অপেক্ষা করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনাই সফল হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বোলিং ইতিহাসের আগের সেরা সাফল্যগুলোর সঙ্গে হাসানের পারফরম্যান্সের তুলনা করলে রেকর্ডটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়।
| সংস্করণ | বাংলাদেশি বোলার | সেরা উইকেট | হাসানের আগের রেকর্ড |
|---|---|---|---|
| টেস্ট | মাশরাফি বিন মুর্তজা | ৩ | ছাড়িয়ে গেছেন |
| ওয়ানডে | রুবেল হোসেন | ৪ | ছাড়িয়ে গেছেন |
| টি-টোয়েন্টি | তাসকিন আহমেদ | ৪ | ছাড়িয়ে গেছেন |
| টেস্ট | হাসান মাহমুদ | ৬ | নতুন সর্বোচ্চ |
| অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাঁচ উইকেট | হাসান মাহমুদ | ৬ | বাংলাদেশের প্রথম পেসার |
| তিন সংস্করণ মিলিয়ে পাঁচ উইকেট | হাসান মাহমুদ | ৬ | বাংলাদেশের প্রথম বোলার |
এই পারফরম্যান্স হাসানের টেস্ট ক্যারিয়ারেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন পর্যন্ত টেস্টে তিনবার এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনটি সাফল্যই দেশের বাইরে এসেছে। ২০২৪ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে এবং পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পর ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটেও এমন সাফল্য পেয়েছেন তিনি।
দেশের বাইরে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো পেসারের তিনবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও হাসানের বোলিং ক্যারিয়ারের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। দেশের কন্ডিশনের বাইরে নিয়মিত কার্যকর বোলিং করতে পারা একজন পেসারের পরিণত হয়ে ওঠার অন্যতম লক্ষণ। হাসানের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই দিকটিই সামনে আনছে।
ইনিংস বিরতিতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের বোলিং পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার জন্য তিনি যে মুখিয়ে ছিলেন, সেটিও জানান। বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকা এবং প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখাকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। লাইন ও লেংথ ঠিক রাখা এবং অধিনায়কের নির্দেশনা অনুসরণ করাকে নিজের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত সাফল্যের কৃতিত্ব অবশ্য একা নিতে চাননি হাসান। তার মতে, সতীর্থ বোলাররা অন্য প্রান্ত থেকে ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ভেঙে পড়েছে। একপ্রান্তে একজন বোলার চাপ তৈরি করলে অন্যপ্রান্ত থেকেও সেটি ধরে রাখা জরুরি। বাংলাদেশ সেই সমন্বয় করতে পেরেছে বলেই স্বাগতিক দলকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ডারউইনের ছয় উইকেট তাই শুধু হাসান মাহমুদের ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়। এটি বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের সাম্প্রতিক অগ্রগতিরও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশনে বাউন্স কাজে লাগানো, ধারাবাহিকভাবে সঠিক জায়গায় বল রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার দক্ষতা দেখিয়ে হাসান প্রমাণ করেছেন, বড় দলের বিপক্ষেও তিনি ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন।
সফরের আগে যে পাঁচ উইকেট নেওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন হাসান, ডারউইনে সেটিকে ছাপিয়ে ছয় উইকেট নিয়েছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ইতিহাসে নিজের নাম আলাদা করে লিখেছেন এই তরুণ পেসার। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং কঠিন কন্ডিশনে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করে তোলা।