১০ লাখ ডলারের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিউজিল্যান্ডকেই বেছে নিলেন স্যান্টনার

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকলেও জাতীয় দলের দায়িত্বকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের সাদা বলের অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের কাছ থেকে দুই বছরের জন্য প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রস্তাব পেয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার। কিন্তু ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি, নেতৃত্বের দায়িত্ব এবং দেশের মাটিতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি তিনি।

স্যান্টনারের সামনে এখন নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। ২২ অক্টোবর থেকে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে তিন সংস্করণের সিরিজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার টেস্টের সিরিজও রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই ব্যস্ত থাকতে হবে তাকে। সেই সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলা এবং নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

এর পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের কেন্দ্রীয় চুক্তি ধরে রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে স্যান্টনারের। দীর্ঘ মেয়াদে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ব্যস্ত হয়ে পড়লে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ ও প্রস্তুতিতে তার উপস্থিতি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছেন এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার।

স্যান্টনারের পরিকল্পনায় রয়েছে আগামী বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় এই বৈশ্বিক আসরে খেলার পাশাপাশি সুযোগ পেলে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের সঙ্গে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি তাই তার কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

স্যান্টনারের এই সিদ্ধান্তকে তার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন নিউজিল্যান্ডের কোচ রব ওয়াল্টার। প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনার সময় স্যান্টনারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন তিনি। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে ওয়াল্টার বলেন, অন্য কারও সিদ্ধান্তকে বিচার করার বিষয় নয় এটি। তবে স্যান্টনারের ক্ষেত্রে দলকে ব্যক্তিগত স্বার্থের আগে রাখার মানসিকতা তার চরিত্রেরই প্রকাশ।

দেশের অধিনায়কত্ব স্যান্টনারের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে বলেও মনে করেন ওয়াল্টার। সামনে থাকা টেস্ট সিরিজগুলোতে খেলার ব্যাপারেও তার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। ফলে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় প্রস্তাব পেয়েও সেটি প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত স্যান্টনারের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত নয় বলে মনে করছেন কোচ।

জাতীয় দলের প্রতি স্যান্টনারের এই অগ্রাধিকার অবশ্য হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর আগেই তিনি কেন্দ্রীয় চুক্তি এবং নেতৃত্বের দায়িত্ব ধরে রাখার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে দেশের মাটিতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিজেকে প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট থেকে পাওয়া আর্থিক সুবিধার চেয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের ভূমিকা ধরে রাখাই তার বর্তমান পরিকল্পনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের অন্য ক্রিকেটারদের পথ অবশ্য এক নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ ধরে রাখতে কয়েকজন খেলোয়াড় নমনীয় চুক্তির ব্যবস্থা বেছে নিয়েছেন। ফিন অ্যালেন, টিম সেইফার্ট, লকি ফার্গুসন, মার্ক চ্যাপম্যান ও অ্যাডাম মিলনের মতো ক্রিকেটাররা এ ধরনের চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ডেভন কনওয়েও নমনীয় চুক্তির ব্যবস্থায় গেছেন।

ফলে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে এখন খেলোয়াড়দের জন্য ভিন্ন ধরনের পেশাগত পথ দেখা যাচ্ছে। কেউ কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থেকে জাতীয় দলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগও ধরে রাখছেন। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিস্তার এবং বিভিন্ন লিগে খেলোয়াড়দের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় দলের সূচি ও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার পরিকল্পনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা ক্রিকেট বোর্ডগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ওয়াল্টার অবশ্য ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। বিশ্বের বিভিন্ন লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া ক্রিকেটারদের দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও একটি প্রতিফলন বলে মনে করেন তিনি। ক্রিকেটের বর্তমান কাঠামোয় খেলোয়াড়দের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকাটা স্বাভাবিক বাস্তবতা বলেই মনে করেন নিউজিল্যান্ডের কোচ।

তবে জাতীয় দলের হয়ে খেলার আগ্রহ ধরে রাখার বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ওয়াল্টার। খেলোয়াড়েরা যেন দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা ধরে রাখেন এবং নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলাকে নিজেদের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, সে পরিবেশ তৈরি করাকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

স্যান্টনারের সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারের দুই বছরের প্রস্তাব সামনে থাকার পরও তিনি জাতীয় দল, নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচিকে বেছে নিয়েছেন। ভারতের বিপক্ষে সিরিজ, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার টেস্ট এবং এরপর দেশের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ—সামনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়কে সামনে রেখে নিউজিল্যান্ডের হয়ে নিজের ভূমিকা ধরে রাখতেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বড় আর্থিক সুযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।

মন্তব্য করুন