সাকিবের ছায়া নয়, নিজের পরিচয় গড়তে বললেন মিরাজ

মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছেতৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট বাছাইপর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর অধিনায়কদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। তরুণ ক্রিকেটারদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে তুলে ধরেন আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম, খারাপ সময় মোকাবিলা এবং ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলিং পরিকল্পনার নানা দিক।

জুনিয়র ওয়ারিয়র্স ক্লাবের অধিনায়ক শাওন মিরাজকে প্রশ্ন করেন, অনেক তরুণ ক্রিকেটারই সাকিব আল হাসানের মতো হতে চান। কিন্তু কেউ যদি মেহেদী হাসান মিরাজের মতো ক্রিকেটার হতে চান, তাহলে তাকে কী করতে হবে?

উত্তরে মিরাজের পরামর্শ ছিল অন্য কারও অনুকরণ না করে নিজের পরিচয় তৈরি করা। তার মতে, প্রতিটি ক্রিকেটারের আলাদা প্রতিভা, দক্ষতা ও খেলার ধরন রয়েছে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়ের মতো হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের সামর্থ্য কোথায়, সেটি বুঝে সেই জায়গায় উন্নতি করার চেষ্টা করা উচিত।

মিরাজ বলেন, সাকিব আল হাসান নিজের জায়গায় অনন্য, তিনিও নিজের মতো। তরুণ ক্রিকেটারদেরও নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে সঠিক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে গেলে আরও ভালো ক্রিকেটার হওয়া সম্ভব। তবে সেই পথের ভিত্তি হতে হবে কঠোর পরিশ্রম ও মাঠের পারফরম্যান্স। শুধু প্রতিভা থাকলেই হবে না, নিয়মিত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেই প্রতিভার প্রমাণ দিতে হবে।

তরুণদের জন্য মিরাজের বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রিকেটে সাফল্য যেমন আসে, তেমনি ব্যর্থতাও আসে। কোনো ম্যাচে খারাপ পারফরম্যান্স কিংবা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পাওয়াকে ক্যারিয়ারের শেষ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

ক্যারিয়ারের খারাপ সময় কীভাবে সামলাতে হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে মিরাজ বলেন, প্রত্যেক ক্রিকেটারের জীবনেই ভালো ও খারাপ সময় আসে। কঠিন সময়ে মানসিকভাবে শক্ত থাকা, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা এবং পরিশ্রম চালিয়ে যাওয়া জরুরি। লক্ষ্য ঠিক রেখে চেষ্টা অব্যাহত রাখলে প্রতিকূল সময় পেরিয়ে সামনে এগোনো সম্ভব।

ক্রিকেটে মানসিক দৃঢ়তার এই বিষয়টি বিশেষ করে তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যর্থ ইনিংস বা খারাপ বোলিং স্পেলের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা, কোচের পরামর্শ গ্রহণ করা এবং পরের ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া একজন খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অংশ। মিরাজের বক্তব্যেও সেই ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব ছিল।

পাওয়ার প্লেতে বোলিংয়ের কৌশল নিয়েও কথা বলেন জাতীয় দলের এই অলরাউন্ডার। তার মতে, ইনিংসের শুরুতে ব্যাটাররা সাধারণত দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন। একই সময়ে ফিল্ডিংয়ের বিধিনিষেধের কারণে বোলারের জন্য রান আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এই পর্যায়ে বোলিং করতে হলে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি রান নিয়ন্ত্রণ এবং চাপ তৈরির দিকেও নজর রাখতে হয়।

মিরাজের পরামর্শ, পাওয়ার প্লেতে শুধু উইকেট নেওয়ার আশায় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। একটি ভালো বল থেকে রান না আসাও বোলারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হতে পারে। ধারাবাহিকভাবে ডট বল করতে পারলে ব্যাটারের ওপর চাপ বাড়ে এবং পরবর্তী বলে ভুল করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। তাই বোলারের উচিত নিজের পরিকল্পনায় স্থির থাকা এবং নির্দিষ্ট জায়গায় বল করার সক্ষমতা বাড়ানো।

ডেথ ওভারের বোলিংয়ে পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন মিরাজ। ইনিংসের শেষ দিকে ব্যাটাররা দ্রুত রান তুলতে আক্রমণাত্মক শট খেলেন। তখন একটি ভুল বলও বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারে। এ কারণে বোলিংয়ের আগে পরিকল্পনা পরিষ্কার থাকা জরুরি। কোন ধরনের বল করা হবে, ফিল্ডার কোথায় থাকবে এবং ব্যাটারের আচরণ অনুযায়ী পরিকল্পনায় কী পরিবর্তন আনা দরকার—এসব বিষয়ে বোলারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়।

দলের বিপর্যয়ের সময় কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে, সে বিষয়েও তরুণদের পরামর্শ দেন মিরাজ। এমন মুহূর্তে হতাশ না হয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নিজের সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাস রেখে ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করলে সেই মানসিকতা দলের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট বাছাইপর্বে অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের জন্য মিরাজের কথাগুলো মাঠের কৌশলের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার পাশাপাশি চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানো এবং দলীয় পরিস্থিতি বুঝে ভূমিকা পালন করার অভিজ্ঞতাও তৈরি হয়। প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে এগিয়ে যেতে এসব গুণ প্রয়োজন।

সাকিবের সঙ্গে নিজের তুলনা প্রসঙ্গে মিরাজের বক্তব্যের মূল সুর ছিল স্বাতন্ত্র্য। একজন তরুণ ক্রিকেটার অন্য সফল খেলোয়াড়দের কাছ থেকে শিখতে পারেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও খেলার ধরন বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের দক্ষতা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতেই নিজের পরিচয় তৈরি করতে হবে।

মিরাজের পরামর্শে তাই একদিকে যেমন ছিল মাঠের ক্রিকেটের বাস্তব কৌশল, অন্যদিকে ছিল দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার মানসিক প্রস্তুতির কথা। পাওয়ার প্লেতে ধৈর্য, ডেথ ওভারে পরিষ্কার পরিকল্পনা, বিপর্যয়ের সময় আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিদিনের অনুশীলনে ধারাবাহিকতা—তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এসব বিষয়কেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার কথায়, অন্যের পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে মেলানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে নিজের পথ তৈরি করাই একজন ক্রিকেটারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন