পাকিস্তান পুরুষ ক্রিকেট দলের নতুন ব্যাটিং কোচ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ক্রিকেটার মাইকেল স্মিথকে নিয়োগ দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। ৪৬ বছর বয়সী সাবেক ডানহাতি ব্যাটারের সঙ্গে দুই বছরের চুক্তি করেছে বোর্ড। খেলোয়াড় হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগ না পেলেও দীর্ঘ ঘরোয়া ক্যারিয়ার এবং পরবর্তী সময়ে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতার কারণে এবার জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন তিনি।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্মিথ টেস্ট এবং সীমিত ওভারের—উভয় সংস্করণেই জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করবেন। আগামী ১৯ আগস্ট ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু হতে যাওয়া তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের আগে তিনি দলের সঙ্গে যোগ দেবেন। ফলে নতুন দায়িত্বে তার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটি। দুই বছরের চুক্তির শুরুতেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পাকিস্তানের ব্যাটিং ইউনিটকে সামলাতে হবে তাকে।
স্মিথের দায়িত্ব কেবল ব্যাটারদের টেকনিক্যাল দিক ঠিক করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ব্যাট করার সক্ষমতা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে উইকেট ধরে রাখা, বলের মুভমেন্ট সামলানো এবং ইনিংসকে বড় করার কৌশল নিয়ে কাজ করতে হবে তাকে। একই সঙ্গে সাদা বলের ক্রিকেটে দ্রুত রান সংগ্রহ, স্ট্রাইক রোটেশন, পাওয়ারপ্লের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ঝুঁকির ভারসাম্য রাখার বিষয়েও নজর দিতে হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটেই স্মিথের খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারের বড় অংশ কেটেছে। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পেশাদার ক্রিকেটে সক্রিয় থাকা এই ব্যাটার ৮৯টি প্রথম শ্রেণির, ৭২টি লিস্ট-এ এবং ১৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। সব সংস্করণ মিলিয়ে তার সংগ্রহ ৭ হাজার ২৯ রান। রয়েছে ৯টি শতক ও ৪০টি অর্ধশতক। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় পার করেও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের সুযোগ পাননি তিনি।
খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে না খেললেও কোচ হিসেবে স্মিথের অভিজ্ঞতা কম নয়। তার রয়েছে লেভেল-৪ কোচিং যোগ্যতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান সুপার লিগের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ইসলামাবাদ ইউনাইটেড, করাচি কিংস ও মুলতান সুলতানসের মতো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে পাকিস্তানের ক্রিকেট সংস্কৃতি এবং স্থানীয় খেলোয়াড়দের সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় দলের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা স্মিথকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সাধারণত বিভিন্ন বয়স, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার খেলোয়াড়ের সঙ্গে কাজ করতে হয়। একই দলের তরুণ প্রতিভা ও প্রতিষ্ঠিত তারকাদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করাও কোচের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পাকিস্তানের ঘরোয়া ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কাজ করার ফলে দেশটির ক্রিকেটারদের মানসিকতা, প্রস্তুতির ধরন এবং পারফরম্যান্সের ওঠানামা সম্পর্কে স্মিথের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে প্রতিভার অভাব নেই। বরং দলটির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উঠে এসেছে ধারাবাহিকতার ঘাটতি। অনেক সময় ব্যাটাররা ভালো শুরু করেও ইনিংসকে বড় করতে পারেন না। আবার চাপের মুহূর্তে উইকেট হারানো, প্রতিপক্ষের বোলিং পরিকল্পনার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারা কিংবা ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের গতি পরিবর্তন করতে না পারার সমস্যাও দেখা যায়। নতুন ব্যাটিং কোচের সামনে তাই ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলীয় ব্যাটিং পরিকল্পনাকে আরও সুসংগঠিত করার চ্যালেঞ্জ থাকবে।
টেস্ট ও সাদা বলের ক্রিকেটে একই ব্যাটারকে ভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়। দীর্ঘ সংস্করণে ধৈর্য, শট নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ইনিংস গড়ার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিয়মিত স্ট্রাইক বদলানো এবং নির্দিষ্ট সময়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করা জরুরি। দুই ধরনের ক্রিকেটেই দায়িত্ব পাওয়ায় স্মিথকে পাকিস্তানের ব্যাটারদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
তার নিয়োগের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—যে ক্রিকেটার নিজে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি, তিনিই এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের ব্যাটিং উন্নয়নের দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে একজন সফল কোচ হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে দীর্ঘ ক্যারিয়ার থাকা অপরিহার্য নয়। খেলোয়াড়ের টেকনিক বিশ্লেষণ, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝানো, প্রস্তুতির ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং মানসিকভাবে ক্রিকেটারকে প্রস্তুত করার সক্ষমতাও কোচের কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
স্মিথের দুই বছরের চুক্তি তাই পাকিস্তানের ব্যাটিং ইউনিটের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ দিয়ে তার কাজ শুরু হলেও সামনে থাকবে দীর্ঘ পথ। তরুণ ও অভিজ্ঞ ব্যাটারদের সমন্বয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলানোর সক্ষমতা এবং তিন সংস্করণে কার্যকর ব্যাটিং পরিকল্পনা তৈরি—সব মিলিয়ে দায়িত্বটি সহজ হবে না।
শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে স্মিথের নিয়োগ কতটা সফল হয়েছে। পাকিস্তানের ব্যাটাররা যদি তার অধীনে আরও ধারাবাহিকভাবে রান করতে পারেন, চাপের পরিস্থিতিতে নিজেদের মেলে ধরতে পারেন এবং ম্যাচের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলাতে সক্ষম হন, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলার অতীত তার কোচিং ক্যারিয়ারের পথে বড় বাধা হয়ে থাকবে না। বরং পাকিস্তানের ক্রিকেটে তার দীর্ঘ ফ্র্যাঞ্চাইজি অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত জ্ঞানই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় সম্পদ।